নিউজ ডেস্ক || আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে *আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকায় বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে ছাত্র-যুবকরা রক্ত দিয়েছিলেন, সেই শহীদদের স্মরণে জাতিসংঘ ২০০০ সাল থেকে এই দিবসটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ঝাড়খণ্ড ও ত্রিপুরায় এই দিবসটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়। ত্রিপুরায় এই দিবসের তাৎপর্য আরও বহুমাত্রিক, কারণ এখানে বাংলার পাশাপাশি ককবরক (ত্রিপুরি ভাষা) এবং অন্যান্য আদিবাসী ভাষাগুলি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রতীক।
ত্রিপুরায় মাতৃভাষার প্রশ্ন শুধু বাংলা-কেন্দ্রিক নয়। রাজ্যের প্রায় ১৯টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ককবরক হলো সবচেয়ে ব্যাপকভাবে কথিত মাতৃভাষা। ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ককবরককে রাজ্যের সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়, যা দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের ফসল। প্রতি বছর ১৯ জানুয়ারি *ককবরক দিবস* হিসেবে পালিত হয়, যা আদিবাসী পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই প্রেক্ষাপটে ২১ ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরার জন্য দ্বৈত তাৎপর্য বহন করে—একদিকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে ককবরকসহ অন্যান্য স্থানীয় ভাষার সংরক্ষণ ও প্রচারের প্রতিশ্রুতি।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ত্রিপুরায় ককবরক ভাষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। রাজ্য সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ককবরক শিক্ষার বিস্তার করেছে। তবে ইউনেস্কোর ‘ভালনারেবল’ (ঝুঁকিপূর্ণ) তালিকায় থাকা এই ভাষাটির সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে—বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে চর্চার অভাব, লিপি নিয়ে বিতর্ক (বর্তমানে বাংলা লিপি ব্যবহৃত হলেও রোমান লিপির দাবি দীর্ঘদিনের) এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির মূলধারায় আরও গভীর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন।
এ বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আগরতলা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। অনেক সংগঠন ককবরকসহ রাজ্যের সকল ভাষার সহাবস্থান ও সমান মর্যাদার দাবি তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ড. মানিক সাহা সম্প্রতি ককবরককে রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ বলে উল্লেখ করে এর সংরক্ষণে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ত্রিপুরার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু একটি স্মরণ নয়, বরং একটি প্রতিশ্রুতি—বাংলা, ককবরক, চাকমা, মগ, হালামসহ সকল ভাষা যেন সমানভাবে বেঁচে থাকে, বিকশিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। ভাষা যখন পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত, তখন তার রক্ষা মানে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করা।
আসুন, আজকের এই দিনে আমরা সকলে প্রতিজ্ঞা করি—ত্রিপুরার ভাষা-বৈচিত্র্যকে আরও শক্তিশালী করে তুলব, যাতে প্রতিটি মাতৃভাষা তার নিজস্ব গৌরব নিয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
মাতৃভাষা দিবসে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা। জয় ককবরক।


