উদয়ন্ত প্রাসাদ (Ujjayanta Palace), যা বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্য জাদুঘর হিসেবে পরিচিত, উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই রাজপ্রাসাদের ইতিহাস উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনাকালের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে আগের রাজপ্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুর নতুন প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্যোগে ১৯০১ সালে উদয়ন্ত প্রাসাদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ব্রিটিশ স্থাপত্য সংস্থা Martin & Burn Company প্রাসাদটির নকশা ও নির্মাণের দায়িত্ব পালন করে। প্রাসাদটি হিন্দু, মুঘল এবং ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য সংমিশ্রণ।
প্রাসাদটির নাম 'উদয়ন্ত' রাখেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 'উদয়ন্ত' শব্দের অর্থ—যেখানে সূর্যের উদয় বা নতুন আলোর সূচনা ঘটে। এই প্রাসাদটি দীর্ঘদিন ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের রাজকীয় বাসভবন এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে উদয়ন্ত প্রাসাদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠান, সভা এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজপরিবারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৪৯ সালে ত্রিপুরা ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর প্রাসাদটি কিছু সময়ের জন্য রাজ্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর এবং পরবর্তীকালে ত্রিপুরা বিধানসভার ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তীকালে ত্রিপুরা সরকার প্রাসাদটিকে সংরক্ষণ করে একটি আধুনিক জাদুঘরে রূপান্তরিত করে। ২০১৩ সালে এখানে ত্রিপুরা রাজ্য জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে জাদুঘরটিতে ত্রিপুরার ইতিহাস, সংস্কৃতি, জনজাতির জীবনধারা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, অস্ত্রশস্ত্র এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে।
আজ উদয়ন্ত প্রাসাদ শুধু ত্রিপুরার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক এবং অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এর মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য, বিশাল গম্বুজ, সুদৃশ্য বাগান, কৃত্রিম হ্রদ এবং মনোরম পরিবেশ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। উদয়ন্ত প্রাসাদ ত্রিপুরার সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং রাজকীয় সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান