অসমের বরাক উপত্যকার তিন জেলা—কাছাড়, শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) এবং হাইলাকান্দিতে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক হারে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাছাড় জেলায় ৭৪ জন, শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) জেলায় ৪৯ জন এবং হাইলাকান্দি জেলায় প্রথমে ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে সেই সংখ্যা সংশোধিত হয়ে ৪০-এরও বেশি বলে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য দপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক তদন্তে নবজাতকদের মৃত্যুর পেছনে চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত হয়েছে।
প্রথমত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের অভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নবজাতক শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পাওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, জন্মের সময় অনেক শিশুর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকছে। চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় মায়েদের অপুষ্টি এবং সময়ের আগেই সন্তান জন্ম নেওয়ার কারণে এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা নবজাতকদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সংক্রমণ। প্রসবের পর হাসপাতাল বা আশপাশের পরিবেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ দ্রুত নবজাতকদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থত, সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের দূরের হাসপাতালে স্থানান্তর করতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে রামকৃষ্ণনগর মডেল হাসপাতালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আল্ট্রাসাউন্ড বা সিজারিয়ান প্রসবের সুবিধা না থাকায় জটিল রোগীদের প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে অসমের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচএম)-এর উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একটি প্রতিনিধি দল তিনটি জেলা পরিদর্শন করেছে। তারা হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছেন।
এদিকে চিকিৎসক সংকটও বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। হাইলাকান্দি সিভিল হাসপাতালে মাত্র দুইজন শিশু বিশেষজ্ঞ দায়িত্ব পালন করছেন, যা জেলার চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ, শিশু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দ্রুত উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে দাবি জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতক মৃত্যুর হার কমাতে শুধু হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেই হবে না; পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপদ প্রসব এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


