শপথের মঞ্চে নতুন সূচনা, কিন্তু দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বোঝা নিয়েই এগোতে হচ্ছে তিপ্রা মথাকে
খুমলুঙে নবনির্বাচিত এমডিসিদের শপথের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (এডিসি)-তে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। তবে এই সূচনা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি সরাসরি পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মন-এর ‘স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন’ গড়ার প্রতিশ্রুতিকে।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তিপ্রা মথা বুঝতে পারছে, এবার আর শুধুই প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। গত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা দলটির সামনে তুলে ধরেছে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বারবার বিদ্ধ হয়েছে প্রশাসন। ‘তিপ্রাহাম’ প্রকল্পে আর্থিক কেলেঙ্কারি, টেন্ডার ছাড়াই ই-অটো বণ্টন, বনভূমি দখলের মতো অভিযোগ জনমানসে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—এই অভিযোগগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান তদন্ত বা নিরপেক্ষ অডিটের অভাব। ফলে জবাবদিহির প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রভাব পড়েছে সরাসরি জনজীবনে। জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকট নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাঙাচোরা রাস্তায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিপর্যস্ত। স্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙে পড়ার মুখে, আর শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট চরমে—হাজারের বেশি স্কুলে এক শিক্ষক দিয়ে একাধিক শ্রেণি চালানোর বাস্তবতা উন্নয়নের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
যে লক্ষ্য নিয়ে এডিসি গঠিত হয়েছিল—জনজাতিদের স্বশাসন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন—তা অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে।
এই প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিতকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নয়, বরং একপ্রকার বাধ্যবাধকতা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। শপথের পর পরিষদীয় বৈঠকে চেয়ারম্যান, মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য ও কার্যনির্বাহী সদস্যদের নির্বাচন—এই প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে প্রশাসনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ। অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি—এই তিন মাপকাঠিই এবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জ কেবল নেতৃত্ব বদলে শেষ হচ্ছে না। প্রকৃত লড়াই হলো ব্যবস্থার ভিত শক্ত করা। দুর্নীতির অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক অডিট এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্থবির উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফেরানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া জনবিশ্বাস পুনরুদ্ধার কঠিন।
সব মিলিয়ে বার্তা স্পষ্ট—এবার প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, ফলাফলের রাজনীতি চাই। প্রদ্যুৎ কিশোর দেববর্মন-এর বার্তা প্রত্যাশা তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রত্যাশাই এখন দলের উপর চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন একটাই—এবার কি সত্যিই বদল দৃশ্যমান হবে, নাকি আবারও ঘোষণার রাজনীতিতেই আটকে যাবে এডিসি?
