ত্রিপুরায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বার্ষিক ঋণ পরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়ে সদ্য প্রকাশিত স্টেট লেভেল ব্যাংকার্স কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক দ্বৈত চিত্র। একদিকে ঋণ বিতরণের সামগ্রিক অগ্রগতি সন্তোষজনক, অন্যদিকে পারফরম্যান্সের তীব্র বৈষম্য এবং খাতভিত্তিক দুর্বলতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে মোট ১২,২৮১.৫২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলি, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭২ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এই অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও এর অন্তর্নিহিত চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়।
রাজ্যে কার্যরত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি এই গড় অর্জন করতে বা অতিক্রম করতে পেরেছে। ফলে প্রায় অর্ধেক ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি বড় ব্যাংকও রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ১৫টি ব্যাংক ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের আনুপাতিক লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ শতাংশও পূরণ করতে পারেনি, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অগ্রাধিকার খাতে ১১,২৪০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৭,২৮৪ কোটি টাকা—অর্জন মাত্র ৬৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য কম। যদিও মোট বিতরণ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সাফল্যের হার কমে যাওয়া ঋণ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে কৃষি খাতে। ৪,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২,৩২৩.৭৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ অর্জন মাত্র ৫৮ শতাংশ। কৃষিনির্ভর ত্রিপুরার জন্য এই ঘাটতি ভবিষ্যতের উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতেও মন্থরতা স্পষ্ট। ৫,০৪০ কোটি টাকার বিপরীতে ৩,৯৭৫.৩৯ কোটি টাকা বিতরণ করে অর্জন ৭৯ শতাংশ হলেও, তা আগের বছরের তুলনায় নিম্নমুখী। একইসঙ্গে ‘অন্যান্য অগ্রাধিকার খাত’-এ ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংক এবং ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে, যেখানে গত বছরের তুলনায় ২৫৬ কোটি টাকা কম বিতরণ হয়েছে।
ব্যাংকভিত্তিক পারফরম্যান্সে দেখা যায়, সমবায় ব্যাংকগুলো ৭২ শতাংশ অর্জন করে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলোর অর্জন ৫৮ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকের ৫২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংকের ৫৫ শতাংশ—যা প্রত্যাশার তুলনায় কম।
সব মিলিয়ে, ঋণ বিতরণের মোট পরিমাণ বাড়লেও কাঠামোগত দুর্বলতা, খাতভিত্তিক পিছিয়ে পড়া এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে পারফরম্যান্সের অসমতা ত্রিপুরার ব্যাংকিং খাতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতি কাটাতে বিশেষজ্ঞরা ব্যাংকগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় বৃদ্ধি, বাস্তবসম্মত খাতভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং দুর্বল পারফরম্যান্সকারী ব্যাংকগুলোর ওপর কড়া নজরদারির ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
