নয়াদিল্লি: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন থেকে উঠে এল বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে জোরালো বার্তা। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংযমের আহ্বান
মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত নিয়ে ঘোষণাপত্রে কোনো পক্ষের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) আওতাধীন পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলার বিষয়েও পরোক্ষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সদস্য দেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্যের মধ্যেও এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একতরফা শুল্কের বিরুদ্ধে ব্রিকস
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই ব্রিকস আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আরোপ করা ‘একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা’-র তীব্র বিরোধিতা করেছে। তবে কোনো দেশ বা নেতার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ভাষা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সদস্য দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্যে একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করলেও ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও প্রতিফলিত করে।
ইউক্রেন সংকটে কূটনীতির পথ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সরাসরি কোনো পক্ষকে সমর্থন না করে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা হয়েছে।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন সংকট সমাধানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শান্তি আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিকসের অবস্থান ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট। গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনকে পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ সদস্যপদ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ১৯৬৭ সালের সীমারেখার ভিত্তিতে, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস।
‘পশ্চিম-বিরোধী জোট নয়’
সম্মেলনে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা বা Multipolar World গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিও এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্পষ্ট করেছেন, ব্রিকস কোনো ‘পশ্চিম-বিরোধী জোট’ নয়। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরাই এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য।
নয়াদিল্লি সম্মেলনের সামগ্রিক বার্তা তাই একদিকে সংঘাত ও একতরফা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর ভূমিকার দাবি। ক্রমবদলমান বিশ্ব রাজনীতিতে ব্রিকস যে নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে চাইছে, ঘোষণাপত্রে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান