‘এটা চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, কসাইখানা—চিকিৎসার নামে মানুষকে মারা হচ্ছে।’ কৈলাসহরের বেসরকারি ‘দ্যা হোপ’ পরিচালিত ঊনকোটি নার্সিং হোমের বিরুদ্ধে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন এক রোগীর পরিজন। শুধু মৌখিক অভিযোগ নয়, নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রী এবং জেলার অভিভাবক মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন তিনি।
অভিযোগকারী আলকাস মিয়ার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তাঁর বোন আয়াতুন বিবি। গত ১৩ আগস্ট তিনি এক স্থানীয় যুবককে সঙ্গে নিয়ে কৈলাসহরের ভগবাননগর এলাকায় অবস্থিত ঊনকোটি নার্সিং হোমে গিয়ে বোনের চিকিৎসা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর কাছে আয়ুষ্মান কার্ড রয়েছে জানিয়ে ওই কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা সম্ভব কিনা জানতে চাওয়া হলে, নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়—শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ নগদে দিতে হবে, তবে বাকি চিকিৎসা বিনামূল্যে হবে বলে অভিযোগ।
এরপর ১৫ আগস্ট আয়াতুন বিবিকে চিকিৎসার জন্য নার্সিং হোমে ভর্তি করানো হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান এবং পরদিন, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট অপারেশন করার কথা জানানো হয়।
আলকাস মিয়ার দাবি, ১৫ আগস্ট দুই চিকিৎসকের ভিজিট বাবদ তাঁকে নগদ ১,৬০০ টাকা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আরও ১২,২০০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু ১৬ আগস্ট দুপুরে অপারেশনের জন্য তাঁর বোনকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত ২০ হাজার টাকা নগদ জমা দেওয়ার কথা বলা হয় বলে অভিযোগ।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আলকাস মিয়া। তাঁর দাবি, আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসার কথা বলা হলেও অপারেশনের ঠিক আগে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হয়। এরপর তিনি বোনের অপারেশন না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে নার্সিং হোম থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
ঘটনার পর ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক মেঘা জৈন, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শরদিন্দু চাকমা, রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রী প্রফেসর ড. মানিক সাহা এবং ঊনকোটি জেলার অভিভাবক মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন আলকাস মিয়া।
শনিবার, ২৯ আগস্ট কৈলাসহরের সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে এসে পুরো ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসা পরিষেবার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে ঊনকোটি জেলার জেলাশাসক মেঘা জৈন এবং মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শরদিন্দু চাকমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা আলকাস মিয়ার লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। বিষয়টি তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
এদিকে, ঊনকোটি নার্সিং হোমকে ঘিরে আয়ুষ্মান কার্ড এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে এর আগেও অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। চলতি মাসের প্রথম দিকেই কৈলাসহরের বিধায়ক বিরজিত সিনহা ঊনকোটি নার্সিং হোমের বিরুদ্ধে আয়ুষ্মান কার্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ তুলে জেলাশাসকের কাছে বিষয়টি জানান বলে জানা গেছে। সে সময় জেলাশাসক তাঁকে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও এতদিন প্রকাশ্যে লিখিত অভিযোগ করতে অনেকেই ভয় পেতেন বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি। এবার সেই ভয় উপেক্ষা করে আলকাস মিয়া প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লিখিত অভিযোগ করায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে ঊনকোটি নার্সিং হোম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে রোগীর পরিজনের সমস্ত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনিক তদন্তে প্রকৃত ঘটনা এবং আয়ুষ্মান কার্ড সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আয়ুষ্মান কার্ডের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রোগীর পরিবারের কাছ থেকে কেন অপারেশনের আগে নগদ ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল? অভিযোগের তদন্তে সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে রোগীর পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় মহল।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান