দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে শেষ হয়েছে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল—TTAADC-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচন। ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই ভোট শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বাইরে থাকা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৬ সালের পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
এই নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় বার্তা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটদানের হার ৮১ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের জন্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে একটি নির্বাচন শুধুমাত্র ভোটের হার দিয়ে সফলতার মাপকাঠিতে পৌঁছায় না। নির্বাচনের আসল মূল্য নির্ধারিত হয় ভোটারদের রায় কতটা স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিফলিত হয় তার ওপর। এই নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। কিছু এলাকায় সংঘর্ষ ও প্রার্থীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্বাচন শেষ মানেই রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ নয়। বরং ভোটের পরেই শুরু হয় আসল কাজ। ৫ অক্টোবর ভোট গণনার দিন। সেই গণনা যাতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে হয় এবং প্রত্যেক প্রার্থীর ভোটের মর্যাদা রক্ষা পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানেও নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
ভিলেজ কমিটি কোনও কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো নয়। গ্রামের রাস্তা, পানীয় জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সরকারি পরিষেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নের মতো মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলির কাজ সরাসরি যুক্ত। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও থাকবে অনেক বেশি।
এই নির্বাচনে কে কতটি আসন পেলেন, কোন দল কতটা এগিয়ে গেল—তা অবশ্যই রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হবে। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের পর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা পরিবর্তন আসে। ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং ভোটের পরে বাস্তব কাজের মধ্যে যেন বড় কোনও ব্যবধান তৈরি না হয়, সেটিই হওয়া উচিত নতুন ভিলেজ কমিটিগুলির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য জয়-পরাজয়ে নয়; গণতন্ত্রের সৌন্দর্য মানুষের রায়কে সম্মান করার মধ্যে। তাই এখন সব রাজনৈতিক দলের কাছে প্রত্যাশা—ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হোক, বিভাজন নয়; রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকুক, কিন্তু মানুষের স্বার্থ যেন তার ঊর্ধ্বে থাকে।
ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ তাঁদের ভোট দিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন। এখন পালা প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সেই রায়ের মর্যাদা রাখার।
ভোট শেষ হয়েছে। এবার শুরু হোক মানুষের জন্য কাজ করার রাজনীতি।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান