গত বছরের তুলনায় ৪৩টি সর্বজনীন দুর্গাপুজো কম, রাজ্য পুলিশের পরিসংখ্যানে উঠে এল নতুন বাস্তবতা—উৎসবের জৌলুসের পাশাপাশি গুরুত্ব পাক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও।
শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনমেলার অন্যতম প্রধান উৎসব। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। আলোকসজ্জা, মণ্ডপ নির্মাণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে শহর থেকে গ্রাম। কিন্তু এ বছর ত্রিপুরায় সর্বজনীন দুর্গাপুজোর সংখ্যা হ্রাসের পরিসংখ্যান নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
রাজ্য পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ত্রিপুরায় মোট ২,৯০৫টি সর্বজনীন দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২,৯৪৮। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে পুজোর সংখ্যা কমেছে ৪৩টি। সংখ্যার বিচারে এই হ্রাস খুব বড় না হলেও এর তাৎপর্য একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজ্যে দুর্গাপুজোর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি; বরং বিভিন্ন সময়ে বৃদ্ধি ও হ্রাস—দুই প্রবণতাই লক্ষ করা গেছে। ২০১৯ সালে যেখানে পুজোর সংখ্যা ছিল ২,৪৫৯, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৯০০-তে। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি পৌঁছায় ২,৯৪৮-এ। সেই বৃদ্ধির পর ২০২৬ সালে পুজোর সংখ্যা কমে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে শুধুমাত্র পুজোর সংখ্যা কমেছে বলেই রাজ্যের সামগ্রিক উৎসবের জৌলুস কমে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। পুজোর সংখ্যা হ্রাসের পিছনে কী কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি, পুজো পরিচালনার খরচ, চাঁদা সংগ্রহের সমস্যা কিংবা ছোট ছোট পুজো কমিটিগুলির সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা—এ ধরনের বিষয় সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। যদিও নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া কোনও একটি কারণকে এর জন্য দায়ী করা সমীচীন নয়।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ছবি। পশ্চিম জেলায় পুজোর সংখ্যা ৭৭২ থেকে কমে ৭১৯ হয়েছে। গোমতী জেলায় ৩৮২ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬৩-তে এবং ধলাই জেলায় ২০৩ থেকে কমে হয়েছে ১৭৯টি। বিপরীতে, সিপাহিজলা জেলায় পুজোর সংখ্যা ৪১১ থেকে বেড়ে ৪২৮ হয়েছে। দক্ষিণ জেলাতেও ২৬৮ থেকে বেড়ে ২৮৭টি পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে, রাজ্যের সব জেলায় পুজোর প্রবণতা এক রকম নয়।
দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। মণ্ডপশিল্পী, আলোকসজ্জার কর্মী, ঢাকশিল্পী, প্রতিমাশিল্পী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—অসংখ্য মানুষ এই উৎসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তাই পুজোর আয়োজন কমে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, পুজোর প্রকৃত সাফল্য শুধু মণ্ডপের সংখ্যা, আলোর চাকচিক্য কিংবা ব্যয়ের বহরে নির্ধারিত হয় না। নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব আয়োজন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বড় বাজেটের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ছোট ও মাঝারি পুজো কমিটিগুলিকে উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েও উৎসবের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব।
এখন প্রয়োজন, পুজোর সংখ্যা কমার কারণ নিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্যোগ। পুজো কমিটি, প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
দুর্গোৎসবের প্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে, শুধু সংখ্যার পরিসংখ্যানে নয়। ত্রিপুরার পুজোর সংখ্যা এ বছর কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিসংখ্যানকে আতঙ্কের কারণ না করে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উৎসবের ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের সামর্থ্য—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই এগিয়ে চলুক ত্রিপুরার শারদোৎসব।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান