জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয় ক্রমেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দ্রুত গলছে হিমবাহ, বাড়ছে হিমবাহ-নির্ভর হ্রদের আকার। আর সেই হ্রদগুলিই একসময় ভয়াবহ হরপাবান বা আকস্মিক বন্যার উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের উচ্চভূমিতে তৈরি হওয়া বহু হিমবাহ হ্রদ এখন কার্যত ‘টাইম বোমা’।
২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে বিশাল হিমবাহ ও শিলাস্তর ধসে পড়ার ঘটনা ফের সামনে এনেছে এই বিপদের ভয়াবহতা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বরফ, পাথর ও বিপুল পরিমাণ জল নেমে এসে তৈরি করে প্রবল কাদা-জলের স্রোত। এর অভিঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, বিজ্ঞানীরা এর মাত্রাকে গিজার পিরামিডের প্রায় ৭০টি বিশাল কাঠামো একসঙ্গে উপত্যকায় আছড়ে পড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
২১০ হিমবাহ হ্রদই বড় সতর্কবার্তা
গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ২১০টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব হ্রদের কোনো একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ জল মুহূর্তের মধ্যে নিচের উপত্যকায় নেমে আসতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত।
ফলে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যেতে পারে একটি গোটা উপত্যকার চেহারা। পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের সঙ্গে এই অতিরিক্ত জল ও ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
‘মেগা সুনামি’র মতো ঢেউও অসম্ভব নয়
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিশাল আকারের হিমবাহ বা পাহাড়ের একটি বড় অংশ কোনো গভীর হ্রদ বা উপত্যকায় হঠাৎ আছড়ে পড়লে সেখানেও সুনামির মতো বিশাল ঢেউ তৈরি হতে পারে।
আলাস্কা ও পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে ২০২৩ সালের হিমবাহ ধসের ঘটনায় কয়েকশো ফুট উচ্চতার ঢেউ তৈরি হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। ফলে হিমালয়ের সংকীর্ণ উপত্যকা ও গভীর পাহাড়ি হ্রদগুলিতে বড় ধরনের ধস ঘটলে তার অভিঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শুধু নেপাল নয়, ঝুঁকিতে ভারতও
এই বিপদের প্রভাব সীমাবদ্ধ নয় নেপালের মধ্যে। ভারতের উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম ও দার্জিলিংয়ের মতো হিমালয়ঘেঁষা অঞ্চলও ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। একই ধরনের বিপদ বিশ্বের অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলেও রয়েছে—নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড ও আইসল্যান্ড তার উদাহরণ।
বিশেষ করে পাহাড়ি নদীর তীরবর্তী জনবসতি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলি আকস্মিক হিমবাহ-উৎপন্ন বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুইজারল্যান্ড দেখিয়েছে, সতর্কতাই বাঁচাতে পারে প্রাণ
তবে এই বিপদের মধ্যেও রয়েছে আশার দিক। ২০২৫ সালের মে মাসে সুইজারল্যান্ডের আল্পস অঞ্চলে বিশাল হিমবাহ ধসে ব্লাটেন গ্রাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু তার আগেই বিপদের পূর্বাভাস পাওয়ায় গ্রামবাসীদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ফলে বড় ধরনের ধ্বংস হলেও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—প্রাকৃতিক বিপর্যয় সবসময় ঠেকানো সম্ভব না হলেও, আগাম সতর্কবার্তা ও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি ব্যাপকভাবে কমানো যায়।
নজরদারিতে ভারত-নেপাল-চীনের সমন্বয় জরুরি
হিমালয় কোনো একটি দেশের সম্পত্তি নয়; এই পর্বতমালা ভারত, নেপাল, চীনসহ একাধিক দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে সমন্বিত নজরদারি জরুরি।
ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলিতে নিয়মিত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, ড্রোন ও সেন্সর-ভিত্তিক নজরদারি, জলস্তর পরিমাপ এবং স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিচের উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মহড়া ও দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও থাকা দরকার।
আজকের হিমবাহ, আগামী দিনের বিপর্যয়
হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া শুধু পরিবেশগত পরিবর্তনের সংকেত নয়—এটি কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। আজ যে হিমবাহ দূর পাহাড়ের চূড়ায় নিঃশব্দে গলছে, আগামীকাল তার জলই কোনো উপত্যকার জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই হিমবাহ হ্রদগুলিকে ‘টাইম বোমা’ হিসেবে চিহ্নিত করেই থেমে গেলে চলবে না। বিপর্যয়ের আগে বিপদ শনাক্ত করা, মানুষকে সতর্ক করা এবং সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াই এখন হিমালয় অঞ্চলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান