দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ত্রিপুরার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে টিটিএএডিসি ভিলেজ কমিটি নির্বাচন। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটিতে ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনকে ঘিরে পাহাড় ও গ্রামীণ এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা ইতিমধ্যেই তুঙ্গে।
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২,৬৩৪টি নির্বাচনী ক্ষেত্রে ৪,৫৯৭টি আসনের জন্য ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রয়েছেন ৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৯৭৭ জন ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ৪১ জন, মহিলা ভোটার ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার ৯৩০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছয়জন। ভোটগ্রহণের জন্য মোট ১,৫৫০টি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এবারের ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ব্যবহার করা হবে। দুর্গম পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত এলাকায় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট সামগ্রী এবং অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে প্রশাসনকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।
এই নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্স নির্দিষ্ট স্ট্রংরুমে রাখা হবে এবং ৫ অক্টোবর ভোট গণনা হবে। প্রয়োজন হলে ৩ অক্টোবর পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এর আগে নির্বাচিত ভিলেজ কমিটিগুলির পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২১ সালের মার্চে শেষ হয়েছিল। কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচন দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়। অবশেষে চলতি বছরের আগস্টে রাজ্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের প্রক্রিয়া ঘোষণা করে।
এবার ৫২টি ব্লকের আওতাধীন এলাকায় ভোটগ্রহণ হবে। তবে মোট ৪,৫৯৭টি আসনের সবকটিতে ভোট হচ্ছে না। চূড়ান্ত প্রার্থী সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১,৬৩০টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফল নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে তিপ্রা মথা ১,৫৪৮টি এবং বিজেপি ৮২টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে ২৮ সেপ্টেম্বরের ভোট মূলত বাকি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলির ফল নির্ধারণ করবে।
ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রচারে নেমেছে। শেষ মুহূর্তে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি প্রচার, ছোট সভা, সাংগঠনিক বৈঠক এবং জনসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছেছেন।
বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী বিভিন্ন এলাকায় সভা ও জনসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সিপিআই(এম) প্রার্থীদের সমর্থনে প্রচার করেছেন। বামেদের প্রচারে উপজাতি অধিকার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, রাস্তা ও পানীয় জলের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট সাংগঠনিক শক্তির উপর জোর দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ড. মানিক সাহাও বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে তিপ্রা মথার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টিটিএএডিসি এলাকায় দলটির সাংগঠনিক উপস্থিতি রয়েছে এবং তাদের প্রচারে উপজাতি স্বার্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, স্থানীয় উন্নয়ন ও সম্প্রদায়ের অধিকার-সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশে দলের চেয়ারম্যান প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মার অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়েছে। যদিও দলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন।
বিজেপি, তিপ্রা মথা এবং আইপিএফটি বৃহত্তর এনডিএ ব্যবস্থার অংশ হলেও কয়েকটি আসনে জোটসঙ্গীদের প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা জানিয়েছেন, এই ধরনের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা জোটের সামগ্রিক ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে না।
রাজনৈতিক সমীকরণের পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে স্থানীয় সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত এলাকায় রাস্তা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলি ভোটারদের কাছে বড় প্রশ্ন।
শাসক পক্ষ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি ও বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরেছে। বিরোধীরা পাল্টা স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘাটতির অভিযোগ সামনে এনেছে। তিপ্রা মথা উপজাতি অধিকার ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
ভিলেজ কমিটি সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে পরিচিতি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সোমবারের ভোটগ্রহণকে সামনে রেখে রাজ্য নির্বাচন কমিশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোটকর্মী, ব্যালট সামগ্রী, নিরাপত্তা এবং স্ট্রংরুম ব্যবস্থাপনা নিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও শেষ করা হয়েছে।
প্রায় ৯.৬২ লক্ষ ভোটার সোমবার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ।
দীর্ঘ কয়েক বছর পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ভিলেজ কমিটির দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে ২৮ সেপ্টেম্বরের ভোট শুধু রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ত্রিপুরার পাহাড় ও গ্রামীণ এলাকার স্থানীয় প্রশাসনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান