ত্রিপুরায় প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (TTAADC)-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা জানান, কেন্দ্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ দিলে ত্রিপুরায় UCC কার্যকর করা হবে। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে এর আওতার বাইরে রাখা হতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী UCC বাস্তবায়নের বিরোধিতা করে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, ত্রিপুরায় UCC কার্যকর করতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে এই ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে একজোট হয়ে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধানে UCC-এর অবস্থান
ভারতীয় সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি মৌলিক অধিকারের অংশ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত।
ফলে ত্রিপুরার বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন শুধু UCC হবে কি না, তা নয়। এর আওতা কতটা হবে, কোন কোন ব্যক্তিগত আইন এর অন্তর্ভুক্ত হবে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও প্রথাগত আইনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ছাড় থাকবে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
উপজাতি আইন ও প্রথা নিয়ে প্রশ্ন
ত্রিপুরায় UCC বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি ও প্রথা। বিবাহ, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রচলিত customary practices-এর সঙ্গে ভবিষ্যতের কোনও অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামোর সম্পর্ক কী হবে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই উপজাতি এলাকাগুলিকে সম্ভাব্যভাবে UCC-এর বাইরে রাখার কথা বলেছেন। ফলে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত আইনি কাঠামো ও সম্ভাব্য ছাড়ের বিষয়গুলি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ত্রিপুরার উপজাতি সমাজের উপর UCC-এর নির্দিষ্ট প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বিরোধীদের রাজনৈতিক আপত্তি
জিতেন্দ্র চৌধুরী UCC-কে সাংবিধানিক বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘু অধিকার এবং উপজাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতিনীতি রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি UCC-কে বিজেপি ও আরএসএসের বৃহত্তর রাজনৈতিক-আদর্শগত অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তবে এগুলি তাঁর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; বর্তমানে প্রকাশ্য কোনও নির্দিষ্ট সরকারি নথি থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে প্রস্তাবিত UCC-এর উদ্দেশ্য উপজাতি বা দলিত সম্প্রদায়ের customary legal protections বিলোপ করা।
জাতীয় রাজনীতির প্রভাব
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের অধীনে থাকা ২১টি রাজ্য ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে UCC চালু করবে। তাঁর এই বক্তব্যের পর ত্রিপুরাতেও বিষয়টি নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
রাজ্য সরকারের অবস্থান আপাতত কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, বিরোধীদের কাছে UCC-কে সামনে রেখে সংবিধান, সংখ্যালঘু অধিকার এবং উপজাতি customary practices-এর প্রশ্ন তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
TTAADC নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে গুরুত্ব
TTAADC-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় উপজাতি পরিচয়, customary rights এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে UCC ইস্যু নতুন একটি রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।
চৌধুরীর সর্বদলীয় আন্দোলনের আহ্বান বাস্তবে কতটা রাজনৈতিক সমন্বয়ে রূপ নেয়, সেটি এখন দেখার বিষয়। বিজেপি, সিপিআই(এম), তিপ্রা মথা-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও নির্বাচনী কৌশলও এই বিতর্কের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।
নজর থাকবে কেন্দ্রের চূড়ান্ত কাঠামোয়
ত্রিপুরায় UCC নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্ক মূলত নির্ভর করবে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোর উপর। বিশেষ করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণসহ কোন কোন বিষয় UCC-এর আওতায় আসবে এবং Scheduled Tribes ও customary laws-এর জন্য কী ধরনের বিধান রাখা হবে—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই মুহূর্তে ত্রিপুরায় কোনও নির্দিষ্ট UCC আইন বা বাস্তবায়নের সময়সূচি ঘোষণা হয়নি। তাই সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও আইনি বিধান প্রকাশের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান