দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে ককপিটের ভিতরে সহ-পাইলটের হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় চরম আতঙ্ক। গুরুতর আহত হওয়ার পরও পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে বিমানটি। বিমানে থাকা ১৭৪ জনই প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে। প্রাথমিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ককপিটে ক্যাপ্টেন মচ্ছরের সঙ্গে সহ-পাইলটের সংঘর্ষ হয় এবং তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর বিমানটির উচ্চতা দ্রুত কমে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুরুতর আহত হওয়ার পরও ক্যাপ্টেন মচ্ছর ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। এরপর বিমানের সামনের অংশে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রু ককপিটে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন।
বিমানে থাকা আরও দুই ফ্লাইদুবাই পাইলটও ঘটনাস্থলে সহায়তা করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিমানটি নিরাপদে সৌদি আরবের তাবুকে নামানো সম্ভব হয়।
ঘটনার সঠিক কারণ এবং ককপিটে কীভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তা এখনও তদন্তাধীন।
ঘটনার পর ভারতীয় ক্যাপ্টেনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা নিয়ে আলোচনার কথা জানান এবং আহত ক্যাপ্টেনের পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
নেতানিয়াহুও ক্যাপ্টেন মচ্ছরের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, তাঁর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাওয়া থেকে রুখতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও গুরুতর আহত অবস্থায় ক্যাপ্টেন মচ্ছরের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেছেন।
জরুরি অবতরণের পর ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে তাবুকের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে। তাঁর চিকিৎসার বিষয়ে পরিবার এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় গুরুতর আহত ক্যাপ্টেনের অস্ত্রোপচারও হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানের যাত্রীদের কয়েকজনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের এক দন্ত চিকিৎসক, ড. শোটা মুসায়েভ, আহত ক্যাপ্টেনকে চিকিৎসা সহায়তা দেন বলে জানা গেছে। তিনি রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক চিকিৎসায় সহায়তা করার পাশাপাশি অভিযুক্ত হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতেও সাহায্য করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কেবিন ক্রু, যাত্রী এবং বিমানে থাকা অতিরিক্ত পাইলটদের সম্মিলিত হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হওয়া থেকে আটকাতে সাহায্য করে।
ঘটনার সময় বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারায় বলে ফ্লাইট-ট্র্যাকিং সংক্রান্ত তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারায়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিমানটি নির্ধারিত গন্তব্য তেল আবিবের পরিবর্তে সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
জরুরি পরিস্থিতির আশঙ্কায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও বিমানটির বিষয়ে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল বলে জানা গেছে।
স্মিত মচ্ছর একজন ভারতীয় বাণিজ্যিক পাইলট। তিনি এর আগে স্পাইসজেটে কাজ করেছেন এবং ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা উড়ান অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর বড় অংশই বোয়িং ৭৩৭ বিমান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি কমান্ডার এবং ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবেও কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।
তাঁর বাড়ি মুম্বাইয়ে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। অভিযুক্ত সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে কী ঘটেছিল এবং সংঘর্ষের পেছনে কী কারণ ছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, ফ্লাইদুবাইও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমান বা সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে।
তদন্তে ককপিটে কথিত হামলা, বিমানের দ্রুত অবতরণ, ককপিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর তদন্ত চলাকালীন ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েল থেকে আসা ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানা গেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলগামী বিমানের পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী একটি নিয়মিত ফ্লাইট ককপিটে সহ-পাইলটের কথিত হামলার পর মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়। গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের পদক্ষেপ, যাত্রী ও কেবিন ক্রুদের হস্তক্ষেপ এবং অতিরিক্ত পাইলটদের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করে।
বিমানে থাকা ১৭৪ জনের কেউ প্রাণ হারাননি। আহত ক্যাপ্টেন বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তদন্তকারীরা ঘটনার পূর্ণ বিবরণ ও হামলার কারণ খতিয়ে দেখছেন।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান