আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপ, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপর জোর ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামে
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা হ্রাস, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থা জোরদার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে সংসদগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। নয়াদিল্লির সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের সংবিধান সদনের সেন্ট্রাল হলে ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
বক্তব্যে ওম বিড়লা আঞ্চলিক সংঘাত, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্যিক উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একাধিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই সমস্যাগুলির মোকাবিলায় এমন সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
ফোরামের আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিশা পাওয়া যাবে বলে আশাপ্রকাশ করেন লোকসভার স্পিকার। তাঁর মতে, এই মঞ্চের সম্মিলিত উদ্যোগ শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করবে এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলির কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েই ব্রিকস এগিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে যৌথ ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য বলে উল্লেখ করেন বিড়লা। তিনি স্পষ্ট করেন, ব্রিকস দেশগুলির আকাঙ্ক্ষা যেন কেবল আলোচনা ও বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং বাস্তব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
যুবসমাজের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ওম বিড়লা বলেন, তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা বোঝা, তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের প্রতিভাকে দেশ গঠনের কাজে যুক্ত করা সংসদগুলির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাঁর মতে, একে অপরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করাই সংসদীয় কূটনীতির প্রকৃত শক্তি।
ভারতকে গণতন্ত্রের জননী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংলাপ, মতের বৈচিত্র্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তির মূল ভিত্তি। এই গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই ভারত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তিনি ১২তম ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সফররত প্রতিনিধিদলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
অন্যদিকে, রাজ্যসভার উপ-চেয়ারম্যান হরিবংশ ভারতকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সমৃদ্ধ সভ্যতাগত ঐতিহ্যের ভাণ্ডার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ভারতের বৈচিত্র্য তার বিশেষ পরিচয়। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিকস বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং সহযোগিতার একটি কার্যকর বহুপাক্ষিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বছরের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস কার্যক্রমে ভারতের সভাপতিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনকেন্দ্রিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কথাও তুলে ধরেন হরিবংশ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ ও কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্ব পরিচালনার কাঠামোয় সংস্কারের মাধ্যমে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা।
উদ্বোধনী অধিবেশনের মূল ভাবনা ‘জনকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য সংসদগুলিকে শক্তিশালী করা’ প্রসঙ্গে হরিবংশ বলেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংসদগুলিকে সতর্ক, জনমুখী, গতিশীল ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই ফোরামের আলোচনা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে কার্যকর সংসদীয় পদ্ধতি খুঁজে পেতে সাহায্য করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শুরুতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশ এবং ১০টি অংশীদার দেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নেতাদের স্বাগত জানান। দু’দিনের এই ব্রিকস সংসদীয় ফোরামের সমাপ্তি আগামীকাল হওয়ার কথা।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান