Saturday, September 5, 2026
Greetings: 15th August
বাড়ি শীর্ষ সংবাদ সুপার এল নিনো: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, নাকি মানবসভ্যতার সামনে নতুন বিপদ?

সুপার এল নিনো: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, নাকি মানবসভ্যতার সামনে নতুন বিপদ?

সুপার এল নিনো: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, নাকি মানবসভ্যতার সামনে নতুন বিপদ?

প্রকৃতি বারবার মানুষকে সতর্ক করে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও খরা, কখনও ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে সেই সতর্কবার্তা সামনে আসে। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে যে আশঙ্কার কথা সামনে আসছে, তা নিছক আরেকটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সম্ভাব্য প্রভাব জলবায়ু, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

ইউকে মেট অফিসের বিজ্ঞানী প্রফেসর অ্যাডাম স্কাইফের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি গভীর সমুদ্রেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি যদি শক্তিশালী এল নিনোর রূপ নেয়, তাহলে ২০২৭ সাল বিশ্বের উষ্ণতম বছরগুলোর একটি—এমনকি রেকর্ড উষ্ণ বছর—হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মানুষ কি এখনও বিষয়টিকে কেবল একটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখবে, নাকি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি শুরু করবে?

এল নিনোর প্রভাব পৃথিবীর এক প্রান্তে খরা তৈরি করতে পারে, আবার অন্য প্রান্তে নিয়ে আসতে পারে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যা। ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আমাজন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরার আশঙ্কা দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিপরীতে পেরু-ইকুয়েডরসহ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চল এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর বড় আঘাত হানতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ভারতের জন্য। আমাদের অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন এখনও কৃষি ও মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক ছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে ধান, গম, আখসহ গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন কমলে শুধু কৃষক নয়, শহরের সাধারণ মানুষও তার প্রভাব অনুভব করবেন বাজারদরের মাধ্যমে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাপ—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

আর এই জায়গাতেই ‘সুপার এল নিনো’র সম্ভাব্য প্রভাবকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের দিকে এগিয়েছে। তার ওপর যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও তীব্র হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘গরম বেশি পড়বে’—এতটা সরল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে পানির সংকট, কৃষি উৎপাদনে ধাক্কা, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এবং একাধিক অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধস।

তবে আতঙ্ক ছড়ানো এই মুহূর্তে সমাধান নয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া ও জলবায়ু পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা থাকে। এল নিনোর শক্তি, স্থায়িত্ব এবং আঞ্চলিক প্রভাব সম্পর্কে সময়ের সঙ্গে পূর্বাভাস পরিবর্তিতও হতে পারে। তাই সম্ভাব্য বিপর্যয়কে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে না দেখে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত।

ভারতের ক্ষেত্রে এখন থেকেই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জল সংরক্ষণ, খরা-সহনশীল ফসলের ব্যবহার, কৃষকদের আগাম আবহাওয়া তথ্য প্রদান, খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত এবং কৃষি বিমার পরিধি বাড়ানো—এসব ব্যবস্থা ভবিষ্যতের ধাক্কা সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলিকেও নিজেদের অঞ্চলের সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুযায়ী পৃথক প্রস্তুতি নিতে হবে।

ত্রিপুরার মতো উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। অতিবৃষ্টি যেমন বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তেমনই দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির ঘাটতি কৃষি ও পানীয় জলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই আবহাওয়ার পরিবর্তনকে শুধু দুর্যোগের সময়ের বিষয় হিসেবে না দেখে আগাম পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির অংশ করা জরুরি।

আজকের পৃথিবীতে জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়। তার প্রভাব আমরা ইতিমধ্যেই বিভিন্নভাবে দেখতে পাচ্ছি। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা তাই আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়িয়ে উন্নয়নের পুরনো মডেল আর কতদিন চলবে, সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

২০২৭ সাল রেকর্ড উষ্ণ হবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু পৃথিবী যে উষ্ণ হচ্ছে এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে—এই বাস্তবতাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সুতরাং আতঙ্ক নয়, চাই প্রস্তুতি।
ভয় নয়, চাই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা।
আর উন্নয়নের পাশাপাশি চাই প্রকৃতির সঙ্গে দায়িত্বশীল সহাবস্থান।

কারণ জলবায়ুর এই লড়াই কোনো একটি দেশের নয়, কোনো একটি সরকারের নয়—এটি সমগ্র মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন।

Santosh Paul
সাংবাদিক (Journalist)

মন্তব্য সমূহ (0)

  • এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

আপনার মতামত জানান

Captcha