ভোটের হিসাবের আগে সংগঠন, সংগঠনের আগে আস্থা—২০২৮-এর পথে ত্রিপুরার বামেদের সামনে এটাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ত্রিপুরার পাহাড়ে সিপিএমের রাজনৈতিক দুর্বলতা এখন আর কোনও বিচ্ছিন্ন নির্বাচনের ফল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। টিটিএএডিসি নির্বাচন থেকে বিধানসভা, এডিসি নির্বাচন থেকে গ্রাম কমিটি—পরপর নির্বাচনের ফলাফল একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করছে। একসময় যে পাহাড় ছিল বামেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক দুর্গ, সেখানেই আজ দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র বিজেপির উত্থানের ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বিজেপি অবশ্যই ত্রিপুরার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে শক্তিশালী হয়েছে আদিবাসী-কেন্দ্রিক রাজনীতি, বদলেছে তরুণ ভোটারের প্রত্যাশা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে দুর্বল হয়েছে সিপিএমের পুরনো গ্রামভিত্তিক সংগঠন।
এটাই বামেদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
একটি রাজনৈতিক দল শুধু নির্বাচনের সময় ভোট চেয়ে কোনও অঞ্চলে শক্তিশালী হতে পারে না। মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পর্ক, স্থানীয় নেতৃত্ব, কর্মী সংগঠন এবং সামাজিক যোগাযোগ—এই সমস্ত কিছুর ওপর দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক আস্থা তৈরি হয়। সিপিএমের অতীত সাফল্যের মূলেও ছিল এই সাংগঠনিক শক্তি।
তাই আজ প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয় যে সিপিএম কতটি আসন পেতে পারে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—পাহাড়ের কতগুলি গ্রামে এখনও সিপিএমের রাজনৈতিক উপস্থিতি সক্রিয়? কতজন তরুণ আদিবাসী নেতা দলটির সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন? কতগুলি পরিবার এখনও বামেদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক অনুভব করে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ২০২৮-এর পথ নির্ধারণ করবে।
সিপিএমের হাতে এখনও ১০ জন বিধায়ক রয়েছে। অর্থাৎ দল শেষ হয়ে যায়নি। ত্রিপুরার রাজনীতিতে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি এখনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিধানসভায় বিরোধী শক্তি হিসেবে টিকে থাকা এবং আগামী দিনে সরকার গঠনের মতো বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি তৈরি করা এক বিষয় নয়।
২০২৮ সালে ক্ষমতায় ফিরতে হলে সিপিএমকে শুধু বিজেপি-বিরোধী ভোটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট মানেই সিপিএমের ভোট—এই সমীকরণ আর আগের মতো কার্যকর নেই। কোনও ভোটার বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেও আঞ্চলিক বা আদিবাসী-কেন্দ্রিক অন্য রাজনৈতিক শক্তিকে বেছে নিতে পারেন।
এখানেই সিপিএমের সামনে আসল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
দলকে আবার বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। বিশেষ করে তরুণ আদিবাসী ভোটারের কাছে।
এর জন্য পুরনো স্লোগান যথেষ্ট নয়। জমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সাংবিধানিক অধিকার, ষষ্ঠ তফসিল, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয় নিয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান দরকার। একই সঙ্গে দরকার এমন নেতৃত্ব, যাঁরা পাহাড়ের সমাজ থেকে উঠে আসবেন এবং পাহাড়ের মানুষের ভাষায় কথা বলবেন।
সিপিএমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তখনই কার্যকর হবে, যখন তা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যাবে। অতীতের সংগঠনকে শুধু পুনরুজ্জীবিত করলেই হবে না; নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
গ্রাম কমিটি নির্বাচন তাই সিপিএমের কাছে একটি সতর্কবার্তা। এই নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে হলে কাজ শুরু করতে হবে একেবারে নিচ থেকে। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে প্রচার নয়, পাঁচ বছর ধরে মানুষের পাশে থাকা—এই পথেই ফিরতে হবে।
২০২৮ এখনও দূরে। এই দূরত্বই সিপিএমের কাছে সুযোগ।
চাইলে দল এখনই পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক পুনর্গঠন শুরু করতে পারে। নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে পারে, গ্রামস্তরের সংগঠনকে সক্রিয় করতে পারে, তরুণদের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংলাপ তৈরি করতে পারে এবং আদিবাসী সমাজের বাস্তব সমস্যাকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।
অন্যথায় ২০২৮-এর আগে যতই বিজেপি-বিরোধী হাওয়া তৈরির চেষ্টা হোক, তার রাজনৈতিক লাভ অন্য কেউ নিয়ে যেতে পারে।
ত্রিপুরার বাম রাজনীতির ইতিহাসে পাহাড় কখনও পার্শ্বচরিত্র ছিল না। পাহাড় ছিল তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সেই স্তম্ভ দুর্বল হয়ে গেলে শুধু কয়েকটি আসন হারানোর প্রশ্ন নয়, গোটা রাজনৈতিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
সুতরাং সিপিএমের সামনে আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ বিজেপিকে হারানোর স্লোগান দেওয়া নয়। তার আগে দরকার মানুষের হারানো আস্থা ফিরে পাওয়া।
পাহাড়ে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ভোটের বাক্স থেকে শুরু হবে না। শুরু হবে মানুষের দরজায় দাঁড়িয়ে।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান